বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর জাতীয় সংসদের আইনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকার উত্তরে গাজীপুর জেলার বোর্ড বাজারে অবস্থিত মূল ক্যাম্পাসটি ৩৫ একর জমির উপর বিস্তৃত, যেখানে ৬টি একাডেমিক স্কুল, ১১টি প্রশাসনিক বিভাগ এবং ৭৯টি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ১৫৫০টিরও বেশি টিউটোরিয়াল কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের প্রায় প্রতিটি কোণে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
আনুষ্ঠানিকতা ও প্রচলন ব্যবস্থা:
বাউবির শিক্ষা কার্যক্রম মূলত দূরশিক্ষণ (Distance Learning) পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, রেডিও‑টিভি লেকচার এবং মুদ্রিত মডিউলের মাধ্যমে পাঠদান করা হয়। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও পরীক্ষা গ্রহণের জন্য একটি সুসংহত তথ্য ব্যবস্থা (BOU Online Assessment System) ব্যবহার করা হয়, যা বিগত কোভিড‑১৯ মহামারির সময়ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষা গ্রহণ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন, বিভাগীয় প্রধান এবং বোর্ড অব গভর্নর্স অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং ট্রেজারার অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাঃ শামীম তাদের দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করেছেন।
উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা:
গত তিন বছরে বাউবি তার শিক্ষা পরিধি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বাউবি পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপিত হয়। উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “সার্টিফিকেট নয়, দক্ষ মানবসম্পদ গড়াই বাউবির লক্ষ্য”।
উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে:
প্রকিউরমেন্ট প্রশিক্ষণ – ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘টেন্ডার, পণ্য ও সেবা ক্রয়’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়, যা বাউবির কর্মকর্তাদের সরকারি ক্রয় আইন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধন– ২০২৫ সালের অক্টোবরে খুলনার পাইকগাছা এবং বাগেরহাটের শরণখোলায় নতুন উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়, যা উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করে।
আন্তর্জাতিক সম্মেলন– উপাচার্য ও ট্রেজারার ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারতের চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত “Consultative Meeting on Blended Learning in TVET” এবং নভেম্বরে কেনিয়ার নাইরোবিতে ACU Council Meeting-এ অংশগ্রহণ করে বাউবির দূরশিক্ষণ মডেলকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
সুনাম ও সফলতা :
বাউবির সুনাম শুধু দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে এটি অষ্টম স্থানে রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৯৬৫,৮৩৮ জন শিক্ষার্থী (২০২০ সাল পর্যন্ত) আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কোর্সে অংশগ্রহণ করে, যা দেশের শিক্ষিত জনশক্তির একটি বড় অংশ গঠন করে।
সফলতার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো:
ব্যবসায় শিক্ষা – বাউবির ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (BBA) প্রোগ্রাম থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশের বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত।
কর্মমুখী শিক্ষা– টিভিইটি (TVET) ক্ষেত্রে বাউবির ডিপ্লোমা কোর্সগুলি স্থানীয় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন করা হয়েছে, যার ফলে স্নাতকদের কর্মসংস্থানের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব:
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম- উপাচার্য, যিনি বাউবির দূরশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সমন্বিত করার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাঃ শামীম- ট্রেজারার,যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছ ও দক্ষ করে তুলেছেন।
এম শমশের আলী– প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য (১৯৯২‑১৯৯৬), যিনি বাউবির আইনি কাঠামো ও প্রথম শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে মুখ্য ছিলেন।
এরশাদুল বারী – প্রাক্তন উপাচার্য, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দশ বছরে শিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
এই ব্যক্তিদের নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা বাউবিকে আজকের এই উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
উপসংহার:
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, তার আনুষ্ঠানিকতা, প্রচলন ব্যবস্থা এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক স্থাপন করেছে। প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মহান শিক্ষাবিদদের অগ্রণী ভূমিকা এই প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় সাফল্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলেছে। ভবিষ্যতেও বাউবি তার শিক্ষা পরিধি আরও বিস্তৃত করে দেশের সকল শ্রেণির মানুষের দোরগোড়ায় জ্ঞানের আলো পৌঁছে দেবে বলে আশা করা যায়।
শোয়েব হোসেন-- 

















